ভ্রমণচারীর ফেসবুক গ্রুপে এখনও যূক্ত হন নাই! এক্ষুনি যূক্ত হোন

সোনারগাঁও জাদুঘরঃ আবহমান বাংলার ঐতিহ্যে অবগাহন

সোনারগাঁও জাদুঘর (Sonargoan Museum) প্রকৃত নাম-  শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর (lok shilpo jadughor)। না এ কোনো স্থাপত্যভারে দাম্ভিক, বিশাল সারি-সারি গ্যালারীতে পরিপূর্ন জাদুঘর নয়। নয় ব্রিটেনের মাদাম তুসো বা ফ্রান্সের ল্যুভের বিখ্যাত জাদুঘর। ঢাকার সোনারগাঁয়ে অবস্থিত অতি সাধারন অথচ প্রাচীন বাংলার গৌরবময়ী ঐতিহ্যে ভরপুর এক সংগ্রহশালা। এ সংগ্রহশালাটি যেন আবহমান গ্রাম বাংলার লোকশিল্প-কারুশিল্পের ঐতিহ্য ধারন করে আছে।

সংগ্রহশালার বিশালতা নয় বরং মহিমান্বিত ঐতিহ্যের শিকড়ে আবদ্ধ গ্রাম বাংলার তথা বাংলার গৌরবের লোকশিল্পকে অণুধাবন করলে জাদুঘরটির বিশালতা খুজে পাওয়া যায়। আর খুব সম্ভবত পর্দার ওপাশে পড়তে থাকা আপনিও এই গভীর উপলব্ধিসম্পন্ন সংঘের একজন গর্বিত সদস্য। হ্যাঁ, ঠিক আপনিই। আর ঠিক এই কারনেই আপনার সোনারগাঁয়ের এই দূর্লভ সংগ্রহশালা ঘুরতে যাওয়া উচিত।

আর হ্যাঁ। যারা ফ্যামিলি নিয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যকে খুব কাছ থেকে দেখতে চান- তাদের জন্যও এটি নিঃসন্দেহে আদর্শ একটি জায়গা। সাপ্তাহিক ছুটিতে ডে ট্রিপে ঘোরার জন্য উৎকৃষ্ট গন্তব্য এই জাদুঘর। আপনার সন্তানকে ছোট বেলাতেই বাঙ্গালীর সত্বার বিশালতার সাথে, আবহমান গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করে দেবার জন্য এর চেয়ে ভাল কোনো জায়গা হয়না।

সোনারগাঁও জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা, নামকরন ও ভৌগোলিক অবস্থান

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৭৫ সালের ১২ই মার্চ সোনারগাঁও লোকশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তবে, লোকশিল্প জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৬ সালের ১৯ অক্টোবর।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামানুসারে জাদুঘরটির নাম রাখা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর।

সোনারগাঁওজাদুঘরটির অবস্থান নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায়। যা রাজধানী ঢাকা থেকে ২৫ কিমিঃ দক্ষিন-পূর্বে এবং ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক তথা মোগরাপাড়া চৌরাস্তা থেকে প্রায় ১ কিমিঃ অভ্যন্তরে এবং নারায়নগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে ২১ কিমি দূরবর্তী।

সোনারগাঁও উপজেলার আয়তন ১৭১.০২ বর্গ কিমিঃ বা ৬৬.০৩ বর্গমাইল

ট্যুর প্লানঃসোনারগাঁও জাদুঘর কিভাবে যাব, কোথায় খাব, প্রবেশ ফি, সময়সূচী

জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের সময় স্বল্প। হয়ত আপনারও। আমি চাই না আপনার কালক্ষেপন হোক। সেই হিসাবেই গাইডটির এ অংশ সাজিয়েছি শুধু তাদের জন্য যারা সোনারগাঁও ট্রিপে যাবার প্রাক্কালে শুধু দিকনির্দেশনা খুজছেন।

তাহলে শুরু করা যাক-

সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর কিভাবে যাব

সোজা গুলিস্তান চলে আসুন। ভাই গুলিস্তান ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকেই বাস, সিএনজি, রিকশা বা অন্য যেকোনো বাহনে করে চলে আসতে পারবেন।

গুলিস্তানের মাওলানা ভাসানি হকি স্টেডিয়ামের সামনে আসুন। এখান থেকে সরাসরি সোনারগাঁগামী বাস পাবেন। এগুলোতে চড়ে বসুন। বাস সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া বাস স্ট্যান্ডে চলে এসছে। কি করবেন এখন? ভাই আপনে চলে আসছেন। নেমে পড়ুন। চিন্তার কিছু নাই সোনারগাঁওগামী বাসগুলোর গন্তব্য এখানেই শেষ।

বাস থেকে নেমে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হবেন। ওভারব্রিজ দিয়েই পার হবেন কইলাম। এরপর রিকশা বা অটো নিয়ে নিন। রিক্সায় গেলে সোনারগাঁও জাদুঘর পর্যন্ত ৪০ টাকা ভাড়া নিবে। অবশ্য পকেটে টাকা না থাকলে শেয়ারের অটোতে বা লোকাল যায় যেসব অটো ওইগুলাতে উঠে পড়ুন। ১০ টাকায় চলে যেতে পারবেন।

কোথায় থাকবেনঃ আপনার থাকা উচিত হবে নাকি হবেনা?

ঢাকা থেকে সোনারগাঁয়ের সড়কপথে দুরত্ব মাত্র ২৭ কিমিঃ। যেতে মাত্র ঘন্টাদেড়েক সময় লাগবে। সেই হিসাবে যেতে আসতে মোটের উপর তিন ঘন্টা সময় লাগতে পারে। এতটুকু সময় ঢাকায় প্রতিদিন আপনার যানজটের সাথে যুদ্ধ করে গন্তব্যে পৌছাতে লেগে যায়।

তাই নয় কি?

এছাড়া সোনারগাঁয়ের মূল আকর্ষণ পানাম নগর ও সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর ঘুরে দেখতে সারাদিন যথেষ্ট। তারপর ঢাকায় ফিরে আসতে মাত্র দেড় ঘন্টা সময় লাগছে। অর্থাৎ ধরেন আপনি অফিস বা ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন এতটুকু সময়ে।

বলাই বাহুল্য বেশিরভাগ পর্যটকই একারনেই সোনারগাঁও রাত্রিযাপন করে না।

তবুও, কোনো কারনে যদি আপনার ঘুরে দেখতে দেরি হয়ে যায়, অথবা সময় নিয়ে ঘুরতে চান তাহলেও দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমার কাছে বাছাই করা একমুঠো হোটেলের তালিকা রয়েছে। আপনার সুবিধার্থে আমি সেগুলো দিয়ে দিচ্ছি।

আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি। সোনারগাঁয়ের পানাম নগর ও লোকশিল্প জাদুঘরের মতো অমূল্য স্থানগুলি সারাদেশ থেকে ঘুরে দেখতে আসার মতো ভ্রমনপ্রিয় ভ্রমনচারীর অভাব হবেনা। সঙ্গত কারনেই সোনারগাঁয়ে কোথায়, কিভাবে থাকা যায় তা জানার দাবি থেকেই যায়।

অনেক কথা হলো। আসুন দেখে নেই-

সোনারগাঁয়ে কোথায় থাকবেন

সরকারী আবাসন

  1. জেলা পরিষদ ডাক বাংলো, সোনারগাঁও উপজেলা কমপ্লেক্স। যোগাযোগঃ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, নারায়নগঞ্জ
  2. বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন রেস্ট হাউজ। যোগাযোগঃ পরিচালক, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। ফোন- ০২৭৬৫৫৬৩৩১ ।

বেসরকারী আবাসন

  1. গন বিদ্যালয় বেইজ। যোগাযোগঃ অধ্যক্ষ, গন বিদ্যালয় বেইজ। যোগাযোগঃ ০১৭৭১২০০২৩০৪
  2. কলাপাতা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। যোগাযোগঃ তত্বাবধায়ক, মোঃ মামুন সিকদার। ফোন-০১৭৬০১৪৪১৪৪
  3. ক্যাফে সোনারগাঁও হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, জাদুঘর ১ নং গেইটের বিপরীতে। যোগাযোগঃ তত্বাবধায়ক, মোঃ পিয়ার হোসেন। ফোনঃ ০১৮১৯৯৩২৬৯৬
  4. তাজমহল হোটেল, জাদুঘর ১ নং গেইট। তত্বাবধায়ক, মোঃ নাসির উদ্দিন। ফোনঃ ০১৭১২২৮৯৭০৮

কি খাবেন, কোথায় খাবেনঃ তথ্যগুলি পকেটের কিছু টাকা বাঁচিয়ে দিবে

একটু থামেন ভাই। ঢাকার ভালো হোটেলগুলি থেকেও এখানে সবকিছুর মূল্য চড়া। তাই হুট করে  খাবার হোটেলে গিয়েই বসে পড়বেন না। আগে মুল্য তালিকা দেখুন, ন্যায্য বা সঙ্গত মুল্য মনে হলেই তবে বসুন। নয়ত পরে বিল দেখে হকচকিত হতে পারেন ( যাদের ঘুরতে যাবার সময় টাইট বাজেট)।

আশেপাশে কয়েকটা রেস্তোরায় ঘুরলে তুলনামুলক কম মূল্যে খাবার পেয়ে যাবেন। আপনার জন্য একটা প্রো-টিপস আছে, এ সংক্রান্ত। দেখতে- “ভ্রমনচারী টিপস” সেকশন থেকে ঢু দিয়ে আসুন।

জাদুঘর বন্ধ ও খোলার সময়সূচি

সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর সাপ্তাহিক বন্ধ বুধবার এবং বৃহস্পতিবার। সাধারন ছুটির দিন বৃহস্পতিবার আর বুধবার অর্ধদিবস। তবে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই বুধবারও বন্ধ রাখে।

সপ্তাহের বাকীদিনগুলোতে অর্থাৎ শুক্র থেকে মঙ্গল সকাল ৯ টা থেকে বিকাল পর্যন্ত লোকশিল্প জাদুঘর খোলা থাকে।

তবে ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ী তথা বড় সর্দারবাড়ী শুধুমাত্র রবি ও সোমবার সকাল ১০ টা হতে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

প্রবেশ ফিঃ জাদুঘর+ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ি[বড় সর্দার বাড়ি]

সোনারগাঁও জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ মুল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। আপনি জাদুঘরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে বিকাশ/রকেট বা অন্যান্য পেমেন্ট প্রসেসর দিয়ে অনলাইনেই টিকেট কিনে রাখতে পারেন। আপনার সুবিধার্থে আপনি ই-টিকেট কাটার জন্য জাদুঘরের ওয়েব ঠিকানাটা দিয়ে দিচ্ছি।

http://www.sonargaonmuseumticket.com.bd/

আবার ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ি তথা বড় সর্দার বাড়ী প্রবেশের জন্য রয়েছে আলাদা ফি। দেশি পর্যটকদের জন্য এই মূল্য ১০০ টাকা।

ভাই আপনাকে যদি কোনো তথ্য দিয়ে উপকার করে থাকি; বা যদি না পারি, কোনো কিছু অপছন্দ হলে বা পছন্দ হলে বা কোনোকিছু ভুল মনে করে থাকলে আপনাকে অনুরোধ করছি, কমেন্ট বক্সে আপনার মুল্যবান মন্তব্যটি জানান।

সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর ভ্রমনের শুভ কামনা রইল!

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং লোকশিল্প জাদুঘর

লোকশিল্প জাদুঘরের গ্যালারিতে সাজিয়ে রাখা গ্রামীন ঐতিহ্য হয়ত আপনার ভালো নাও লাগতে পারে- তবে আমি হলফ করে বলতে পারি আপনি নিজের ভেতরের সত্বাকে ভালবাসেন- বাঙালী হিসাবে গর্ব করতে পছন্দ করেন। পহেলা বৈশাখে বাঙালী সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের গৌরবে মত্ত হয়ে অনাবিল এক বাঙালী সত্ত্বাকে লালন করতে থাকেন।

আমাদের গর্ব করা এ বাঙালী সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করার পেছনে নিরব অথচ সবচেয়ে মূল্যবান অবদানটি গ্রমীন মাটি ও মানুষের লোক ও কারুশিল্পের। একটা জাতির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে তাদের স্বতন্ত্র জায়গাগুলি থেকে, স্বতন্ত্র গৌরববোধের জায়গাগুলি থেকে। আবহমান গ্রাম বাংলার লোকশিল্প এককালে আমাদের গৌরববোধের প্রানকেন্দ্র ছিল, ছিল এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সারা পৃথিবীতে একচ্ছত্র নাম ছিল এ শিল্পের।

এইতো ঠিক আমি যখন লিখছি তখনই প্ত্রিকায় দেখলাম, “বাংলার শীতল পাটির বিশ্ব স্বীকৃতি”। ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলের সংবাদ হবে এটি। এমন অজস্র  লোকশিল্প আমাদের ছিল, যা একসময় আমাদের গর্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কে জানে! হয়ত একদিন খবরের কাগজে দেখব- “বাংলার মৃৎশিল্পের বিশ্বস্বীকৃতি”, “বেত শিল্পের বিশ্বস্বীকৃতি” ইত্যাদি ইত্যদি।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি -“গ্রামীন নকশীকাথার বিশ্বখ্যাতি, বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি”- অবশ্য এটা আপনাদের জানা কথা।

সোনারগাঁ জাদুঘরে গিয়ে নকশী কাঁথা দেখে হয়ত পুলকিত নাও হতে পারেন, যতক্ষন পর্যন্ত না একটি নকশীকাথার আত্নকথাকে অন্তর আত্নায় ধারন করতে না পারবেন।

গ্রামীন মায়ের নিরবে করা সেলাইয়ের প্রতিটা ফোড়ে ফোড়ে জীবনের এক-একটি গল্প রচিত থাকে। হয়তঁ সেসব অতি  সহজ-সরল গল্প কিন্তু এর মাঝেই জীবনের তাৎপর্য নীহিত। নিতান্ত সাধারন কিছু নয়, বরং এই নকশীকাথার প্রতিটা ফোড়ে বাঙ্গালী মায়ের তথা সামষ্টিক অর্থে বাঙালীর আত্নকথা রচিত।  

জাদুঘরের গ্যালারীতে রাখা নকশীকাথার সামনে কিছুক্ষনের জন্য দাড়িয়ে সেসমস্ত উপলব্ধি করে আসবেন- ছেলেমেয়েদেরকে গুরুত্বটা বোঝাবেন।

এমনিভাবে জাদুঘরের গ্যালারীতে সাজিয়ে রাখা হরেক-রকম  নৌকা দেখতে সুন্দর লাগতে পারে- তেমনি অনূভুতির গভীরবোধে হারিয়ে  গিয়ে নিজেকে পালতোলা নৌকায় ভাসাতে আরও সুন্দর লাগবে।

প্রাচীন বাংলার নদীমাতৃক এই সূরর্নভূমিতে হরেক রকমের নৌকার সাথে মানবমন কিভাবে মিলেমিশে ছিল কল্পনা করে দেখতে পারেন- কথা দিচ্ছি অন্তরালে অন্য এক “আপনাকে” খুজে পাবেন।

লোকশিল্প জাদুঘরের ১০ টি গ্যালারির প্রত্যেকটিতেই বাঙালী সংস্কৃতির মৌলিক দ্রব্যাদিদেখতে পাবেন। কাঠ-খোদাই, পটচিত্র ও মুখোস, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, পোড়ামাটির নিদর্শন,তামা-কাসা পিতল-লোহার তৈরি নানান নিদর্শন, লোকজ অলংকার, সনাতন ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি ইত্যাদি। বর্তমানে লোকশিল্প জাদুঘরে ৫৪৭৮ টি নিদর্শন রয়েছে।

জাদুঘরের গ্যালারীতে এরকম সাজিয়ে রাখা প্রতিটা নিদর্শনে ডুব দিয়ে অবগাঁহন করে আসবেন- না কোনো টাইম মেশিন দিয়ে না, আপনার-আমার প্রতিটা বাঙালীর অস্থিমজ্জায় লুকিয়ে থাকা বাঙালী বোধের বিশালত্ব ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধ হওয়া বাঙালীবোধ ও সমাজ ব্যাবস্থার ভেতর দিয়ে।

লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের গোড়াপত্তন

গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি ও লোকশিল্পের ইতিহাস সহস্র বছরের পুরোনো।

সে কোনো ফিকে ইতিহাস নয়, সে ইতিহাস প্রতিটা বাঙ্গালীকে গৌরবের রাজত্বকে কিছুক্ষনের জন্য দোদুল্যমান করে তুলবে। গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধ সেসব ইতিহাস আমাদের দাম্ভিত করে তোলে, বাঙ্গালী স্বত্বার শিকড়ে বিশাল ঝড় তুলে।

তবে সেসব আজ শুধুই ইতিহাস!

গ্রাম বাংলার চিরায়ত সেসব সংস্কৃতির বেশিরভাগই বিলুপ্ত, অবশিষ্টটুকুও আজ বিপন্ন।

সোঁনালী সেসব অতীত আর টিকে থাকা গ্রামীন শিল্পকে ধরে রাখতে উদ্যোগ নেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। এ লক্ষে, তিনি ১৯৭৫ সালের ১২ই মার্চ পানাম নগরের একটি পুরোনো বাড়িতে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে, ১৯৮১ সালে গ্রামীন লোকজ শিল্পের পরিচয় তুলে ধরতে খ্যাতনামা এ শিল্পী জাদুঘর স্থাপনে প্রয়াসী হন। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলার লোক ও কারুশিল্পের সংরক্ষন করা, বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া এবং সাথে সাথে গৌরবময়ী শিল্পকে আধুনিক বাংলার সব মানুষের সাথে পরিচয় করে দেওয়া। সেইসাথে বাংলাদশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও লোকজ-সংস্কৃতি একযোগে প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা।

প্রাকৃতিক পরিবেশে সুপ্রাচীন কাল থেকে সমৃদ্ধ হওয়া গ্রামীন সংস্ক্তিকে জাদুঘরের গ্যালারীতে তা ধরে রাখা সম্ভব নয়ঃ প্রয়োজন মুক্ত গ্রামীন প্রাকৃতিক পরিবেশ। শিল্পাচার্য এ পরম সত্য বুঝেছিলেন। একারনে পূর্বে স্থাপিত লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনকে পানাম নগরীর অদূরে ১০০ বছরের পুরাতন সর্দার বাড়িতে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেন। “ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ি” তথা “বড়সর্দারবাড়ির” প্রাঙন ও তৎসংলগ্ন ১৫০ একর জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। উল্লেখ্য, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান।

লোকশিল্প জাদুঘর ভ্রমনঃ যা যা দেখবেন [লোকশিল্প ফাউন্ডেশনের সবকিছু]

বিশাল এই জায়গা জুড়ে রয়েছে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, লোকজ মঞ্চ, সেমিনার হল, সুবিশাল সমৃদ্ধ লোক ও কারুশিল্প লাইব্রেরি, লোক ও কারুশিল্প রুপক গ্রাম, ডকুমেন্টেশন সেন্টার, কারুমঞ্চ, মনোরম লেক, বড় সর্দার বাড়ি বা ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ী ও তার  সামনের বিশাল পুকুর, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত ভাস্কর্যসমূহ ইত্যাদি। চলুন একে একে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর

সোনারগাঁও জাদুঘর

লোকশিল্প জাদুঘর যে ভবনটিতে স্থাপিত তার সামান্য পূর্বে আরেকটি ভবনে জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর স্থাপিত। ভবনটিতে মাত্র ২ টি গ্যালারী রয়েছে। একটি গ্যালারিতে দেখা মিলবে প্রাচীন ও আধুনিক কালের কাঠের তৈরি নানান নিদর্শন। নিদর্শনগুলি ছাড়াও কিভাবে প্রাচীনকালে কাঠের তৈরি কারুপন্য কেনা-বেচার সামগ্রিক প্রক্রিয়াও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা আছে।

লোকশিল্প ফাউন্ডেশন লেক

কেমন হয় যদি জাদুঘরে ঘুরতে গিয়ে শান্ত-সুনিবিড় স্বচ্ছতোয়া জলে ভরা বিশাল লেকে পড়ন্ত বিকেলের রৌদ্রে পঙ্খীরাজ নৌকায় চড়ে বেড়াতে পারেন?
এর সাথে আরও যদি মাছ ধরার সূযোগ পান, তাহলে এর চেয়ে নিখুত কোনো বেড়ানোর জায়গা হতে পারেনা, তাইনা?

ঠিক তাই, এজন্যই বলেছিলাম ফ্যামিলি টাইম স্পেন্ট করার জন্য ঢাকার কাছাকাছি দিনে যেয়ে দিনেই ঘুরে আসার মতো এরকম একটা পারফেক্ট জায়গা খুব কমই আছে। লোকশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল আয়তনের জায়গাজুড়ে লোকশিল্প গ্রাম ঘেষে নয়নাভিরাম এই লেক আপনার মন জুড়িয়ে দিবে। নৌবিহার থেকে শুরু করে মাছ ধরার সুবর্ণ সূযোগ আপনাকে অভুতপূর্ব অভোলনীয় এক অভিজ্ঞতা দিবে।

উল্লেখ্য লোকশিল্প ফাউন্ডেশনের লেকে নৌকায় চড়তে ঘণ্টাপ্রতি আপনাকে ৪০ টাকা খরচ করতে হবে। আর পুরো একদিনের জন্য বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে খরচ পড়বে ১,৭৫০ টাকা।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি

বিশাল এই জায়গার একটি অংশে দেখা মিলবে লোক ও কারুশিল্প লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে মূলত দেশের লোকশিল্প নিয়ে লেখা বইয়ের সম্ভার মিলবে। লোকগীতি, লোক-পঙক্তি ছাড়াও এই শিল্পকে তুলে ধরা বিভিন্ন বইয়ের ভালো সংগ্রহ রয়েছে এখানে।

লোক ও কারুশিল্প গ্রাম

পরিবার ও ছোট-ছেলেমেয়ে নিয়ে জাদঘরের মত নিরস জায়গাঁ ঘুরতে গিয়ে ছায়া-সুনিবিড় সবুজ-শ্যমলে অরন্যে ভরপুর গ্রামীন পরিবেশ পাওয়া মানে হল “কলা বেচতে গিয়ে রথ দেখতে পাওয়ার মত এক অভিজ্ঞতা”। হেই ডু ইউ ওয়ান্ট টু মিস ইট আউট?

কখনই না!

১৫০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল এই  জায়গায় গ্রামীন লোকশিল্প রূপক কারুশিল্প গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে আবহমান গ্রাম বাংলার চেনা পরিচিত রুপ তাড়া করে ফিরে যেন! সেই চিরচেনা গ্রামীন দোচালা-চৌচালার ঘর থেকে শুরু করে উপজাতীদের প্রচলিত ঘরবাড়ি দেখতে পাবেন এখানে। পাশাপাশি এখানে দক্ষ কারুশিল্পীর হাতে তৈরি বাঁশ-বেত , কাঠ-খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশীকাথা, লোকজ বাঁদ্যযন্ত্র, মৃৎশিল্পীর নিপুন হাতে গড়া মাটির তৈজসপত্রসহ ঐতিহ্যবাহী নানান কারুপন্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় হয়ে থাকে । সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়-ক্লান্তিকর একঘেয়ে শহুরে জীবন থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার পাবেন-পারবেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে।

ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ি

সোনারগাঁও জাদুঘর
লোকশিল্প কমপ্লেক্সে অবস্থিত ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ী

স্থানীয়ভাবে এই জমিদারবাড়ি বড় সর্দারবাড়ি নামে পরিচিত। ঈসা খাঁ তৎকালীন বার ভুঁইয়ার নেতৃত্বস্থানীয় একজন জমিদার ছিলেন। “বার ভুঁইয়া” এ নামের নিশ্চয়ই পরিচিত? প্রচন্ড প্রতাপশালী ছিল বার ভুইয়ার জমিদারেরা। তাদের প্রধান ছিলেন ঈসা খাঁ।

ঈসা খাঁর শাসনামলে সোনারগাঁও ছিল বাংলার রাজধানী। সেসময়, আনুমানিক ১৬০০ সালের দিকে তিনি সোনারগাঁয়ে অসাধারন স্থাপত্যশৈলীর এই জমিদার বাডিটি নির্মান করেন। উল্লেখ্য ঈসা খাঁর শাসনামলে পানাম নগরের মত কারুকার্যে সম্ভম অসাধারন এক বানিজ্যিক নগরী প্রতিস্থিত হয়।

ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ী
ঈসা খাঁ জমিদার বাড়ীর সামনে

ঈসা খাঁ জমিদার বাড়িটি দ্বিতল কক্ষের ছিল। এই দুইতলা বিশিষ্ট ভবনের দুই তলা জুড়ে মোট ৮৫ টি কক্ষ ছিল। অসাধারন কারুকার্যখচিত এই বাড়িটি মার্বেল পাথরে নির্মিত। শ্বেত পাথরের চাকচিক্য বাড়িটির সৌন্দর্যকে অসাধারন করে তুলেছে। শ্বেত পাথরের উজ্জ্বল বিকিরন সামনের পুকুরের পানিতে পুরো বাড়ির প্রতিবিম্ব তৈরি করে। অভুতপুর্ব সে দৃশ্য।

লোকশিল্প মেলাঃ একবার ঘুরে আসতে পারেন

প্রতিবছর জামজমকপুর্ন ও মহাআড়ম্বরের সাথে প্রতিবছর বৈশাখ মাসে আয়োজিত হয় লোকশিল্প মেলা। পুরো মেলা এমনভাবে সাজানো হয় যেন এতে পরিপূর্নভাবে বাঁঙালী ও বাঙালীর লোক সংস্কৃতির প্রকাশ পায়। লোকগান, পালাগান, জারিগান, কবিগান, ভাবগান, যাত্রাপালাসহ লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা পরিবেশিত হয়। দেশের নানান স্থান থেকে টিকে থাকা প্রতিভাবান লকশিল্পীর আগমন ঘটে। লোক ও কারুশিল্প কমপ্লেক্স প্রাঙন পরিনত হয় কবি-গুনীজন- সাহিত্যিকদের বিশাল এক মিলন মেলায়।

আরেকটা মজার তথ্য দিয়ে দেই। ধরুন আপনার বুটিক বা ক্রাফটস এর ব্যাবসা আছে। আপনি অবশ্যই আপনার ব্যাবসার পরিচিতি বাড়াতে চাইবেন, ব্রান্ড ভিসিবিলিটি বাড়াতে চাইবেন। লোকশিল্প মেলায় স্টল দিয়ে তেমনটা অনায়াসেই করা যায়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্ত্রাদের জন্য় বেশি ফলপ্রুস হবে এটি।

কিন্তু কিভাবে স্টল নিবেন, কি কি প্রসেস?

চিন্তা নেই মামা 😉। আমি আছি না :3

স্টলের জন্য আবেদন থেকে শুরু করে পুরো প্রকৃয়াটি আপনি অনলাইনে করতে পারবেন। এই ওয়েবসাইটে  গিয়ে শুরু করে দিন তাহলে।

http://folkfair.teletalk.com.bd/options/plog.php ( নতুন ট্যাবে ওপেন হবে)

হ্যাপি অনট্রাপ্রিনিয়ারশীপ (‘_’)

গাড়ি পার্কিং নিয়ে কিছু কথা ও খরচাপাতি

অনেকেই হয়ত ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বেড়াতে যাবেন। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে গেলে বড় একটা মাথাব্যথার কারন হলো পার্কিং। প্রকট হয়ে ওঠে যখন পার্কিং ফ্যাসিলিটি না থাকে।

তবে সোনাগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে বেড়াতে গেলে সে ঝামেলায় সে দুশ্চিন্তা করা লাগবেনা। লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সুন্দর পার্কিং সুবিধা রয়েছে। আমি নিচে গাড়ীভেদে পার্কিং এর মূল্য তালিকা সন্নিবেশন করছি।

  • প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসঃ ১০০ টাকা
  • কোসটারঃ ২০০ টাকা
  • বাসঃ ৩০০ টাকা
  • মোটরসাইকেল, সিএনজিঃ ২৫ টাকা
  • বাইসাইকেলঃ ৩০০ টাকা

ভ্রমনচারী টীপস

  • সোনারগাঁও বেড়াতে গিয়ে স্পেশালি সোনারগাঁও জাদুঘরের সামনের রেস্টুরেন্টগুলোতে ভুলেও বসবেন না। পানাম নগরের প্রধান ফটক সংলগ্ন রেস্টুরেন্টগুলোর ক্ষেত্রেও একই টিপস প্রযোজ্য।

ভ্রমনচারী রেটিংস

৯/১০

উপসংহার

আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ লোকশিল্প জাদুঘরে যারা বেড়াতে যাবেন অনুগ্রহ করে শুধুমাত্র ঘোরার জন্য ঘুরবেন না, দেখার জন্য  দেখবেন না। বাঙ্গালী কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, আমাদের স্বকীয় জাতীসত্ত্বা তুলে ধরার পেছনে আমুর্ত অবদান রাখা এই মহান ঐতিহ্যকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করা আমাদের জন্য আবশ্যক বলে মনে করি। সুতরাং বেড়ানোর আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি এই মহান অনুভূতিকে নাড়াচাড়া করে দেখা থেকে যেন আমরা বঞ্চিত না হই।

এখন আপনার কাছে আমার একটা প্রশ্ন করার পালা!

আপনি আমাকে কমেন্ট করে বলবেন লোকজ দ্রব্যাদির মধ্যে ঠিক কোন জিনিসটা আপানার সবচেয়ে ভাল লাগে?

বার বার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ

লোকশিল্প জাদুঘর কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৯৯৬ সালে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন।

বাংলাদেশের জাতীয় লোকশিল্প জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?

ঢাকার অদূরে নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায়।

সোঁনারগায়ে শ্যুটিং স্পট ভাড়া করতে কত খরচ হয়?

৩৪৫০ টাকা

References

১। http://www.sonargaonmuseum.gov.bd/site/page/a91a443f-f76a-4038-a14d-4ae3cab20a3e/- 

২। উইকিপিডিয়া। bn.wikipedia.org/সোনারগাঁও উপজেলা।

৩। উইকিপিডিয়া। bn.wikipedia.org/সোনারগাঁও উপজেলা।

ভ্রমণ, লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় আসক্ত। কাচ্চির আলু আর দুধ খেজুরে পিঠার পাগল। আমাকে খুজে পাবেন ফেসবুক, টুইটারে।

Twitter | Facebook

মনের কথা বলুন

ভ্রমণচারীর সাপ্তাহিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

সপ্তাহের সেরা লেখাগুলি সবার আগে পৌছে আপনার কাছে!

অভিনন্দন! আপনি সফলভাবে সাবস্ক্রাইব করে ফেলেছেন।

Pin It on Pinterest

Shares
Share This