ভ্রমণচারীর ফেসবুক গ্রুপে এখনও যূক্ত হন নাই! এক্ষুনি যূক্ত হোন

রমনা পার্কঃ কালের সাক্ষী হয়ে আছে যে উদ্যান

রমনা পার্ক (Ramna park) কে বলা হয়ে থাকে ঢাকার ফুসফুস। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততম যান্ত্রিক কোলাহল থেকে আপনাকে একটু হলেও প্রশান্তি এনে দিবে- চিরসবুজ এই উদ্যানটি। ঢাকার দূষিত বাতাসের মাঝে সতেজ বাতাসের বিশাল এক ভাণ্ডার এই পার্ক।

জানেন কি? ভ্রমণচারীর ফেসবুক গ্রুপে ভ্রমণ সম্পর্কিত সমসাময়িক যেকোনো প্রশ্ন করে তাৎক্ষনিক উত্তর পাওয়া যায়। যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন

রমনা পার্ক বাংলার সাংস্কৃতিক- ঐতিহ্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। পার্কটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের “গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের” অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।

রমনা পার্কের ইতিহাস

রমনা পার্ক (ramna park) বাংলাদেশের অতিপ্রাচীন একটি পার্ক। মোগল শাসন আমলে বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা। তখন মোগলরা ঢাকার প্রানকেন্দ্র রমনাতে এই উদ্যানটি প্রতিষ্ঠা করে। ধারনা করা হয় ১৬১০ সালে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁর শাসনামলে উদ্যানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মোগল সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গীর। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় উদ্যানটির নাম ছিল “বাগ-ই-বাদশাহি” যা ১৮২৪ সাল পর্যন্ত একই নামে পরিচিত ছিল। সে সময়ে  উদ্যানটি বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল।

এখনকার সোহরাওয়ারদী উদ্যান কিন্তু তখন এই রমনা পার্কের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর রমনা এলাকা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এরই ফলে রমনা উদ্যান ও রেসকোর্স ময়দান আলাদা হয়ে যায়। সোহরাওয়ারদী উদ্যান বাাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত “রেসকোর্স ময়দান” নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে মোগল সম্রাজ্যের পতনের পর অযত্ন-অবহেলায় উদ্যানটি তার শ্রী হারিয়ে ফেলে এবং জঙ্গলে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ কালেক্টর ডাঊঊজ ঢাকার উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্লান করেন। তারই অংশ হিসাবে রমনা পার্কের উন্নয়ন করেন। উনিশের দশকে ঢাকার নবাবদের উদ্যানটি চোখে আসে। তখন ইংরেজ শাসকদের সহায়তায় ঢাকায় নবাবেরা উদ্যানটির ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। উন্নয়ন পরিকল্পনাটি ১৯০৮ সালে গৃহীত হয় এবং পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগে যায়। ১৯০৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত পার্কটির উন্নয়ন কাজ চলে।

এ সময় নবাবেরা উদ্যানটিতে একটি রাজকীয় বাগান গড়ে তোলেন যার নাম দেয়া হয় “শাহবাগ”। এমনকি নবাবেরা এখানে একটি চিড়িয়াখানা গড়ে তুলে। পরে চিড়িয়াখানা মিরপুরে স্থানান্তর করা হয়। রমনা পার্কের আনুষ্ঠানিক উদ্ভোদন করা হয় ১৯৪৯ সালে। উদ্ভোদনের সময় পার্কের আয়তন ছিল ৮৮.৫ একর এবং তখন ৭১ প্রজাতির গাছ ছিল। স্থান স্ংকটসহ বিভিন্ন কারনে বর্তমানে পার্কতির আয়তন আরও ছোট হয়ে ৬৮.৫ একরে ঠেকেছে।

পার্কটির করুন ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালে পাক-হানাদারেরা বর্বরতা শুরু করে। এই দানবেরা ২৫ মার্চের সেই কাল রাতে “রমনা কালী মন্দির” এবং পাশের “মা আনন্দ আশ্রম” ধ্বংস করে, এমনকি আশ্রমে আশ্রয় নেয়া ২০০ জন হিন্দুকে হত্যা করে।

রমনা পার্কে দেখার মত কি আছে?

রমনা পার্কে বর্তমানে ১৯২ প্রজাতির বিভিন্ন গাছপালা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৭১ প্রজাতির বিরুত, বর্ষজীবী ও বহুবর্ষজীবী, ৩৬ প্রজাতির ফলদ গাছ, ৩৩ প্রজাতির ভেষজ গাছ, ৪১ প্রজাতির বনজ বৃক্ষ এবং ১১ প্রজাতির অন্যান্য গাছপালা।

জানেন কি? ভ্রমণচারীর ফেসবুক গ্রুপে ভ্রমণ সম্পর্কিত সমসাময়িক যেকোনো প্রশ্ন করে তাৎক্ষনিক উত্তর পাওয়া যায়। যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন

বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালার এমন সমারোহ থাকার কারনে অনেক অভিভাবকই তার সন্তানকে দেশীয় প্রজাতির গাছের সাথে পরিচয় করাতে পার্কটিতে নিয়ে আসেন। রমনা পার্কের সবচেয়ে সুন্দর যে জিনিসটা খুব সহজেই সবাইকে টানে তা হলো স্বচ্ছ জলে ঘেরা বিশাল লেকটি। লেকটির আয়তন ৮.৭৬ একর।

বর্তমানে রমনা পার্কে রয়েছে চমৎকার সব আধুনিক বিশ্রাম করার মত স্থাপনা। পাশাপাশি সুন্দর ওয়াকওয়ে এবং অসাধারন গার্ডেন ল্যাম্প পার্কটিকে অনিন্দসুন্দর রুপদান করেছে।

রমনা
বিশ্রামের জন্য নির্মিত সুন্দর সুন্দর বসার জায়গা

রমনা পার্কে গেলে সবসময় কোনো না কোনো ফুলের দেখা মিলে। এর কারন রমনা উদ্যানে রয়েছে নানা প্রজাতির ফুলগাছ। বসন্তে রমনা পার্কের রক্তিম কৃষ্ণচূড়া, বর্ষার কেয়া আর হেমন্তের পিতপাটলা উদ্যানটিকে পরিনত করেছে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। এখানে আরও  দেখতে পাওয়া যায় বিরল “অশোকবিথি”।

বৃক্ষের নানা বৈচিত্রময় প্রজাতিও লালন করে আসছে উদ্যানটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রেইনট্রি, মেহগনি,   বিরলপ্রজাতির “মহুয়াগাছ” ও “পাদাঊক গাছ”।

পার্কটির ঠিক দক্ষিন-পশ্চিম পাশে অবস্থিত বিখ্যাত বটব্ক্ষ। এখানেই প্রতিবছর বাংলা প্রানের বর্ষবরন ঊৎযাপিত হয়। এই সময়ে হাজার-হাজার নর-নারীর পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে পার্কটির সবুজ চত্বর। সমগ্র ঢাকার মানুষ যেন এদিন এখানে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যায়।

রমনা পার্ক কেন যাবেন (দেখার কি আছে?)

গনপূর্ত মন্ত্রনালয়ের অধীনে বর্তমানে পার্কটির উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলমান। যা ২০২২ সালের জুন নাগাদ শেষ হওয়ার কথা।

শত কোলাহল থেকে দূরে একটুখানি প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চাইলে ঢাকার ভেতরে রমনা পার্কের চেয়ে কোনো ভাল জায়গা হতে পারেনা।

আপনি যদি আপনার হৃদয়ে থাকা বাঙলী সত্বাটাকে একটু হলেও অনুভব  করতে পারেন- তাহলে অবশ্যই আপনাকে একবার হলেও রমনা পার্কে যাওয়া উচিত। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য  ধারণ করে আছে সেই ঐতিহ্যের সাক্ষি হতে, সেই ঐতিহ্যের অংশ হতে স্বশরীরে প্রতিটি বাঙলীর উচিত ঘুরে আসা।

প্রতি বছর এই রমনা পার্কের বটমূল মেতে ওঠে বাঙালি নববর্ষ “পহেলা বৈশাখ” উৎযাপনে। এই বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। রমনার বটমুল এইদিন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। 

Ramna park dhaka
সকালের মৃদুমন্দ ঝিরঝিরে বাতাসে এমন অসংখ্য প্রকৃতি অনুরাগী ব্যয়াম করতে বের হয়

শুধু সাংস্কৃতিক কারনেই যাবেন ব্যাপারটিও ঠিক সেরকম নয়। ঢাকা শহরে যেখানে দম ফুসরতের ঊপায় নেই, একটিবারও সতেজ বাতাস গ্রহনের সুযোগ নেই, চারদিকে ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন-সেখানে রমনা পার্কে পাবেন চমৎকার সতেজ-নির্মল বাতাস। প্রতিটি সতেজ নিঃশ্বাস আপনার কাছে মনে হবে যেন আপনি নতুন করে এক একটি জীবন পাচ্ছেন।

বাহারি রং-বেরঙের ফুল আপনার মনে দোলা দিয়ে যাবে। মনে করিয়ে দিবে সোনালি স্মৃতি। নিয়ে যাবে দূর শৈশবে। নানান প্রজাতির দেশী গাছপালা আপনাকে আপনার বাঙ্গালি সত্বাকে আরেকবার ঝালাই করে দিবে।

পার্কের বিশাল লেকের স্বচ্ছ পানি আপনার মনের কালি অনেক খানিই ঘুচে ফেলবে, দূর করবে নাগরিক জীবনের সব হতাশা।

Romna park
রমনা লেক

এই পার্কটি আপনাকে ঢাকার আরও বিভিন্ন  ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নবাবদের বর্ণীল ইতিহাস ও তাদের কীর্তি সম্পর্কে আপনার অনেক কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হবে। ঢাকার নবাবদের অসংখ্য কৃতিত্বের মধ্যে আহসান মঞ্জিল অন্যতম।

উল্লেখ্য, রমনা পার্কের ঠিক বিপরিত পাশেই রয়েছে “শিশু পার্ক“। আপনার বাচ্চাকে নিয়ে তাই দুই জায়গায় ঘুরে আসতে পারবেন।

কিভাবে যাবেন?

তাহলে, রমনা পার্ক কিভাবে যাব? ঢাকার বাইরে থাকলে প্রথমে ঢাকায় আসতে হবে। এরপর ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে বাসে, সিএনজিতে অথবা রিকশায় করে শাহবাগে আসতে হবে। শাহবাগ মোড় থেকে  কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই রমনা পার্ক দেখিয়ে দিবে। ১-২ মিনিট হাঁটলেই উদ্যানটিতে পৌঁছানো যাবে। 

রমনা পার্কের সময়সুচী

প্রতিদিন সকাল ৬:০০ টা থেকে সন্ধা ৭:০০ টা পর্যন্ত রমনা পার্ক খোলা থাকে।

পার্কের প্রবেশমূল্য

রমনা পার্ক সর্ব-সাধারনের প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত। পার্কে প্রবেশ করতে কোনো টিকেটের প্রয়োজন হয়না-সম্পূর্ণ ফ্রি।

কোথায় খাবেন 

রমনা পার্কটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায়, আশেপাশে প্রচুর রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এছাড়াও হালকা-পাতলা মুখোরোচক খাবারের জন্যে অনেকগুলি ভ্রাম্যমান দোকান পাবেন।

কোথায় থাকবেন

থাকার হোটেলের জন্যে আপনাকে মোটেও চিন্তা করতে হবেনা। কারন পার্কটির আশেপাশে অসংখ্য  নামকরা হোটেল রয়েছে। ঢাকার বিখ্যাত “সোনারগাঁও হোটেল” শাহবাগ থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে। রমনা পার্ক দেখার পাশাপাশি ঐতিহাসিক-স্মৃতিবিজড়িত এই হোটেলে রাত কাটাতে পারার সুযোগ থাকলে আপনার উচিত হবেনা হাতছাড়া করা।

শেষকথা

ঢাকা শহরে যেখানে দম ফুসরতের উপায় নেই, একটিবারও সতেজ বাতাস গ্রহনের সুযোগ নেই, চারদিকে ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন-সেখানে রমনা পার্কে পাবেন চমৎকার সতেজ-নির্মল বাতাস। প্রতিটি সতেজ নিঃশ্বাস আপনার কাছে মনে হবে যেন আপনি নতুন করে এক একটি জীবন পাচ্ছেন।

আপনি কি রমনা পার্কে গিয়েছেন? মন্তব্য করে জানাবেন।

বলতে ভুলে গেছিলাম, ভ্রমণচারীর একটা ফেসবুক গ্রুপ আছে, যেখানে মানুষজন ভ্রমণ সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য শেয়ার করে থাকে! আপনি কি সেখানে যুক্ত হতে চান? এখানে ক্লিক করে যোগ দিন।

ভ্রমণ, লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় আসক্ত। কাচ্চির আলু আর দুধ খেজুরে পিঠার পাগল। আমাকে খুজে পাবেন ফেসবুক, টুইটারে।

Twitter | Facebook

মনের কথা বলুন

ভ্রমণচারীর সাপ্তাহিক নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন

সপ্তাহের সেরা লেখাগুলি সবার আগে পৌছে আপনার কাছে!

অভিনন্দন! আপনি সফলভাবে সাবস্ক্রাইব করে ফেলেছেন।

Pin It on Pinterest

Shares
Share This